
স্টাফ রিপোর্টার : চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশ অংশগ্রহণ করেনি।শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের তথ্যে জানা গেছে, গত বছরের তুলনায় অনুপস্থিতির হার বাড়ায় শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক-সব স্তরেই শিক্ষার্থী অনিয়মিততা, শিক্ষক সংকট ও ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার চিত্র সামনে আসছে।
চলতি বছরের ২ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অংশ নিচ্ছেন প্রায় সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী। অথচ দুই বছর আগে এসএসসি ও সমমান পাস করে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিল প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
শিক্ষা খাতের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরও অনুপস্থিতির হার ছিল ২৯ শতাংশের বেশি। এক বছরের ব্যবধানে তা আরও প্রায় ৭ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে বলে বিশ্লেষণে দেখা যায়। ধারাবাহিকভাবে এই প্রবণতা উচ্চশিক্ষায় প্রবেশে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এ বছর এই বোর্ডে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪ শতাংশের বেশি পরীক্ষার ফরম পূরণই করেননি।
শুধু উচ্চমাধ্যমিক নয়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরেও অনিয়মিত উপস্থিতির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একটি সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত থাকে না বলেও তথ্য সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০ হাজারের বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান চলছে। এর মধ্যে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৭০২টি।
এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি হলেও প্রায় ২ হাজার ৮৪২টি পদ শূন্য রয়েছে, যা মোটের প্রায় ১৮ শতাংশ। পাশাপাশি ৩৮৩টি প্রধান শিক্ষক পদও শূন্য রয়েছে, যা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশ। কিছু বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ এখনও সৃষ্টি হয়নি বলেও জানা গেছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ও শিক্ষক সংকট শিক্ষার মান ও তদারকিকে দুর্বল করছে।
চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপির প্রায় ২ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বেশি।
অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে জাতীয় অগ্রযাত্রার ‘মূল কেন্দ্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছে, শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়, বাস্তব ব্যবস্থাপনা ও মানোন্নয়নও জরুরি।
কিছু বিশ্লেষক ও কলামিস্টের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষা ব্যবস্থার অনিয়ম, শিক্ষার্থী অনাগ্রহ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা বেড়েছে। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তন, আন্দোলন-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশগত পরিবর্তনকে এ প্রবণতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে এসব দাবি ও ব্যাখ্যা নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। অন্য একটি পক্ষ মনে করে, অর্থনৈতিক চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, শিক্ষার মানের পার্থক্য এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতাই মূল কারণ।
প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার প্রবণতা, শিক্ষক সংকট এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা—সব মিলিয়ে দেশের শিক্ষা খাত চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে শিক্ষার মান, পরিবেশ ও নীতি বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আপনার মতামত লিখুন :